উন্নয়নের প্রকৃত মাপকাঠি বনাম ভোগবাদী মরীচিকা
এই দর্শনের বিপরীতে আমরা আজ এমন এক অদ্ভুত আত্মপ্রবঞ্চনার যুগে বাস করছি, যেখানে কংক্রিটের আকাশচুম্বী ইমারত আর জিডিপির ঊর্ধ্বমুখী রেখাকেই অগ্রগতির চূড়ান্ত মাপকাঠি ধরা হয়। কিন্তু নিভৃতে একটু ভাবুন তো—কবে আপনি নিশ্চিন্তে বিশুদ্ধ বাতাসে বুক ভরে শ্বাস নিয়েছেন? কবে কোনো নদীর ধারে দাঁড়িয়ে স্বচ্ছ জল দেখে মুগ্ধ হয়েছেন? কবে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে গর্ববোধ করেছেন, কিংবা অসুস্থ হলে খরচের কথা ভেবে আতঙ্কিত হননি? অথচ গণমাধ্যমে প্রতিনিয়ত চোখে পড়ে চোখধাঁধানো প্রবৃদ্ধির গল্প। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—উন্নয়ন আসলে মাপা হয় কীসে? বিলিয়ন ডলারের মেগাপ্রকল্পে, নাকি নাগরিকের সুস্থ ও নিরাপদ জীবনে?"উন্নয়ন আসলে মাপা হয় কীসে? বিলিয়ন ডলারের মেগাপ্রকল্পে, নাকি নাগরিকের সুস্থ ও নিরাপদ জীবনে? যদি প্রথমটিই হয়, তবে দখল হয়ে যাওয়া মৃতপ্রায় নদী, শহরের বিষাক্ত বাতাস, বেকারত্ব-নির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা আর সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ওঠা চিকিৎসাব্যয়ের হিসাব কোন পরিসংখ্যানে লেখা থাকবে?"উন্নয়নের যে মরীচিকার পেছনে আমরা আজ ছুটছি, তা মূলত চাপিয়ে দেওয়া ভোগবাদী ‘জলবায়ু ঔপনিবেশিকতা’ ছাড়া আর কিছুই নয়। আপনার বিমানের ডানায় এবং লেজে যদি আগুন ধরে যায়, তবে প্রচণ্ড গতি নিয়ে আপনি কী করবেন? ধ্বংস তো অনিবার্য! পশ্চিমা বিশ্বের অপরিকল্পিত শিল্পায়ন আর কার্বন নিঃসরণ আজ বিশ্বকে এমনই এক জ্বলন্ত বিমানে পরিণত করেছে। যে পরিবেশবিনাশী প্রযুক্তি ও অন্ধ ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের দম্ভে পৃথিবীকে বসবাসের অযোগ্য করে তোলা হচ্ছে, তা কখনোই শুভ হতে পারে না।
ঋণের ফাঁদ আর প্রবৃদ্ধির এই ইঁদুর দৌড়ে আমরা সজ্ঞানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রাণপ্রকৃতিকে নিলামে তুলছি। একবিংশ শতাব্দীর এই ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে তাই সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি হলো—অন্যের ধার করা ধ্বংসাত্মক মডেলে আমরা কি নিজেদের বিলীন করব, নাকি এ দেশের মাটি, মানুষ ও ভূ-প্রকৃতির সাথে মানানসই টেকসই পথ তৈরি করব? উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ মাইকেল টোডারো ও স্টিফেন স্মিথ দেখিয়েছেন, অগ্রগতি শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নয়, বরং তা নির্ভর করে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, সামাজিক মূল্যবোধ এবং মানবসম্পদের ওপর।আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ও বিশ্বব্যাংকের সমীক্ষায় বহুবার প্রমাণিত হয়েছে, বৈশ্বিক মুক্তবাজার অর্থনীতি ধনী ও দরিদ্র দেশের মধ্যকার আয়ের ব্যবধান ঐতিহাসিক মাত্রায় বাড়িয়েছে। জলবায়ু গবেষণাসংস্থা ‘জার্মানওয়াচ’-এর সূচক অনুযায়ী বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ ভূখণ্ড। পুঁজিবাদী দেশগুলো নিজেদের স্বার্থে গত দুই শতাব্দী ধরে বায়ুমণ্ডলে যে বিপুল কার্বন ছেড়েছে, তার ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়নে আমরা আজ প্রথম সারির ভুক্তভোগী। তা সত্ত্বেও আমাদের নীতিনির্ধারকেরা ‘ঋণ-ভিত্তিক প্রকল্প’ মডেলের ঘোর থেকে বের হতে পারছেন না।
ভুটানের 'জাতীয় সুখ' ও পরিবেশবান্ধব সংবিধান
এই ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসার বাস্তবসম্মত দৃষ্টান্ত হিসেবেই শুরুতে ভুটানের কথা বলেছিলাম। ১৯৭০-এর দশকে তাদের দূরদর্শী চতুর্থ রাজা জিগমে সিংয়ে ওয়াংচুক জিডিপির চেয়ে ‘গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস (GNH)’ বা জাতীয় সুখকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তখন ভোগবাদী অর্থনীতিবিদেরা তা হেসে উড়িয়ে দিলেও জলবায়ু বিপর্যয় ও সামাজিক অবক্ষয়ের এই যুগে এসে তাঁর দর্শনটিই সবচেয়ে আধুনিক, বিজ্ঞানসম্মত ও টেকসই হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।১৯৭০-এর দশকে ভুটানের দূরদর্শী চতুর্থ রাজা জিগমে সিংয়ে ওয়াংচুক জিডিপির চেয়ে ‘গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস বা জাতীয় সুখকে গুরুত্ব দেন। তখন পশ্চিমা ভোগবাদী অর্থনীতিবিদেরা তা হেসে উড়িয়ে দিলেও জলবায়ু বিপর্যয় ও সামাজিক অবক্ষয়ের এই যুগে এসে তাঁর দর্শনটিই সবচেয়ে বিজ্ঞানসম্মত। এদেশে বনাঞ্চল ৭২ শতাংশ। ফলে ভুটান শুধু কার্বন নিউট্রাল নয়, বিশ্বের অন্যতম ‘কার্বন নেগেটিভ’ দেশ।একটি দেশের গুণগত পরিবর্তন সাধিত হয় তার সংবিধানের পবিত্রতা ও নেতৃত্বের নৈতিকতার ওপর ভিত্তি করে। প্রতিবেশী রাষ্ট্রটির সংবিধানে দেশের অন্তত ৬০ শতাংশ ভূমি চিরকাল বনাঞ্চল রাখার কথা থাকলেও বাস্তবে তা ৭২ শতাংশ। ফলে তারা শুধু কার্বন নিউট্রাল নয়, বিশ্বের অন্যতম ‘কার্বন নেগেটিভ’ দেশ। সমগ্র দেশের সব জাতীয় উদ্যান এবং অভয়ারণ্য পরস্পরের সাথে ‘বায়োলজিক্যাল করিডোর’ বা প্রাকৃতিক পথের মাধ্যমে সংযুক্ত রয়েছে। ক্ষমতার মোহ ত্যাগ করে দেশ ও প্রকৃতির প্রতি এমন নিঃস্বার্থ ভালোবাসার কারণে তাদের রূপরেখাকে এই পৃথিবীর আদর্শ মডেল বললে মোটেও অত্যুক্তি হবে না। এমন দায়বদ্ধতার বিপরীতে বাংলাদেশের চিত্র চরম হতাশাজনক। সংবিধানের ১৮(ক) অনুচ্ছেদে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের চমৎকার বিধান থাকলেও দুর্নীতি ও সদিচ্ছার অভাবে সুন্দরবনসহ দেশের বনভূমি ও নদীগুলো আজ মৃতপ্রায়; আর ঢাকা পরিণত হয়েছে শীর্ষ দূষিত শহরের প্রতিশব্দে। ভুটানের দর্শন আমাদের শেখায়—পরিবেশই স্বাস্থ্যের মূলভিত্তি।
সংবিধানের ১৮(ক) অনুচ্ছেদে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের চমৎকার বিধান থাকলেও দুর্নীতি ও সদিচ্ছার অভাবে সুন্দরবনসহ দেশের বনভূমি ও নদীগুলো আজ মৃতপ্রায়; আর ঢাকা পরিণত হয়েছে শীর্ষ দূষিত শহরের প্রতিশব্দে। ভুটানের দর্শন মতে, একটি দেশ মূলত বাঁচে তার তিনটি প্রকৃত সম্পদ— মাটির উর্বরতা, পানি ও বাতাসের বিশুদ্ধতার ওপর।একটি দেশ মূলত বাঁচে তার তিনটি প্রকৃত সম্পদ— মাটির উর্বরতা, পানি ও বাতাসের বিশুদ্ধতার ওপর। এগুলোকে ধ্বংস ও বিষাক্ত করে কোনো অর্জনই দীর্ঘস্থায়ী হয়আগামী। বাংলাদেশে ক্যান্সার, ফুসফুসের রোগ ও কিডনি জটিলতার বিরাট অংশ আসছে এই ভয়াবহ দূষণ থেকে। হাজার কোটি টাকা খরচ করে হাসপাতাল বানালেও নদীর মৃত্যু, পাহাড় কাটা এবং পরিবেশবিনাশী কার্যক্রম বন্ধ না করলে কোনো চিকিৎসাব্যবস্থাই তা সামাল দিতে পারবে না।
'ওয়াশিংটন কনসেনসাস' ও আমাদের আত্মপ্রবঞ্চনা
‘ওয়াশিংটন কনসেনসাস’ (শব্দটি বোল্ড করুন) বা চাপিয়ে দেওয়া প্রেসক্রিপশন অন্ধভাবে মেনে আমাদের প্রকৃত ভাগ্যোন্নয়ন সম্ভব নয়। এই মডেল মূলত আমাদের অতিভোগ করতে এবং প্রকৃতি ধ্বংস করে জিডিপি বাড়াতে শেখায়। এই নির্মম চিত্রটি সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট হয় আফ্রিকার দিকে তাকালে। সেখানে হীরা, স্বর্ণ ও কোবাল্টের লোভে বহুজাতিক গোষ্ঠীগুলো একদিকে স্থানীয়দের হত্যা করে শিশুদের দাসে পরিণত করছে, অন্যদিকে চটকদার বিজ্ঞাপনে সেই রক্তমাখা সম্পদকেই নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রযুক্তিপণ্য ও আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে বিশ্ববাজারে বিক্রি করছে।আফ্রিকার হীরা, স্বর্ণ ও কোবাল্টের লোভে বহুজাতিক গোষ্ঠীগুলো একদিকে স্থানীয়দের হত্যা করে শিশুদের দাসে পরিণত করছে, অন্যদিকে চটকদার বিজ্ঞাপনে সেই রক্তমাখা সম্পদকেই নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রযুক্তিপণ্য ও আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে বিশ্ববাজারে বিক্রি করছে।এই ভোগবাদী ভণ্ডামির সবচেয়ে ভয়ংকর দিকটি হলো—প্রাণ দেওয়া সাধারণ মানুষের জীবনের কোনো মূল্য না থাকলেও, এ অঞ্চলের বিলুপ্তপ্রায় বন্য প্রাণীর চামড়া দিয়ে তৈরি দেড় লাখ ডলার মূল্যের বিলাসবহুল ব্যাগ ব্যবহার করাকে আধুনিকতা বলে প্রচার করা হয়। তাই বাংলাদেশকে আজ ভাবতে হবে, তার প্রকৃত সুখ কোথায়? ক্যাসিনোতে গিয়ে বিলিয়ন ডলার ওড়ানো, সিন্থেটিকের পোশাক পরা আর রাতভর নৈতিক অবক্ষয়মূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকার নাম কোনোভাবেই আমাদের সুখ হতে পারে না।
সময় এখন নিজস্ব ‘বেঙ্গল ডেল্টা মডেল’ গড়ার
অন্ধ অনুকরণ ছেড়ে আমাদের মাটি, কৃষ্টি ও প্রকৃতির সাথে মানানসই সম্পূর্ণ নিজস্ব একটি ‘বেঙ্গল ডেল্টা মডেল’ (শব্দটি বোল্ড করুন) প্রয়োজন। প্রাচীনকাল থেকেই বাংলার উর্বর মাটি ও বিপুল ঐশ্বর্য পুরো বিশ্বকে চুম্বকের মতো আকর্ষণ করেছে। গত তিন হাজার বছর ধরে বাণিজ্য, ধর্মপ্রচার, জ্ঞানার্জন কিংবা সাম্রাজ্য বিস্তারের মোহে এখানে ছুটে এসেছে গ্রিক বীর, চীনা পরিব্রাজক, আরব-পারসিক বণিক থেকে শুরু করে তুর্কি, আফগান, মোগল, ফিরিঙ্গি, ওলন্দাজ, ফরাসি ও ইংরেজরা। যে ভূখণ্ডের প্রাচুর্য যুগে যুগে এতগুলো পরাশক্তি ও জাতিকে আকৃষ্ট করেছে, উন্নয়নের জন্য আজ তার নিজস্ব কোনো মডেল থাকবে না—তা কি মেনে নেওয়া যায়?"যে ভূখণ্ডের প্রাচুর্য যুগে যুগে এতগুলো পরাশক্তি ও জাতিকে আকৃষ্ট করেছে, উন্নয়নের জন্য আজ তার নিজস্ব কোনো মডেল থাকবে না—তা কি মেনে নেওয়া যায়?"
লেখক: শিক্ষাবিদ ও উদ্যোক্তা; পরিচালক, ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (আইবিএ), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, নর্দান ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের (এনইউবি) ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান।
বিজ্ঞাপন









