অন্তর্বর্তী সরকার দেশটির ভঙ্গুর অর্থনীতি সামলানোর কঠিন চ্যালেঞ্জ সামনে রেখে সাময়িক সময় পেয়েছে। কিছু খাতে সীমিত স্থিতিশীলতা আসলেও সামগ্রিক গন্তব্য এখনও অনেক দূরে। এ বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট পেশ করেছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। গত সোমবার তিনি ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করেন, যেখানে তিনি বৈষম্যহীন ও টেকসই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণের সংগ্রামের পরিধি এবং দীর্ঘ পথের কথা এই বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে। তবে বাজেট নিয়ে অর্থনীতিবিদ, বিশ্লেষক ও রাজনৈতিক মহলের সমালোচনা এসেছে। তাদের মতে, এটি মূলত আগের সরকারের নীতির ধারাবাহিকতা; বড় কোনো পরিবর্তন বা নতুন উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না, বরং কিছু খাতে সামান্য বাড়তি বরাদ্দ কিংবা কিছু খাতে কমানোর প্রবণতা রয়েছে।
অর্থ উপদেষ্টা বাজেটে তিনটি শূন্য লক্ষ্য তুলে ধরেছেন — শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব এবং শূন্য কার্বন নির্গমন। তিনি বলেন, এমন এক সমাজ গড়াই হচ্ছে যেখানে সবাই সুশিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সুন্দর জীবন উপভোগ করবে এবং বৈষম্য থাকবে না। প্রস্তাবিত বাজেটে ২ লাখ ৫১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ঘাটতির হিসাব রাখা হয়েছে, যার মধ্যে অনুদান ছাড়া ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা, যা মোট জিডিপির ৩.৬ শতাংশ।
বিশ্বব্যাংকের সাবেক অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন এই বাজেটের রাজস্ব পদক্ষেপকে সাহসী বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলছেন, এবার কর নির্ধারণের ক্ষেত্রে এমন অনেক ক্ষেত্রের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে যা আগে করের আওতায় আসতো না। ভ্যাট অব্যাহতিও ব্যাপকভাবে কমানো হয়েছে। তবে আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক ও ভ্যাটের মাধ্যমে স্থানীয় শিল্পের সুরক্ষা কমানো হয়েছে, যা ব্যবসায়ীদের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। রাজস্ব আদায়ে সরকারের পদক্ষেপ কঠিন হলেও স্পষ্ট।
দেশের অর্থনীতি এখনও পক্ষাঘাতগ্রস্ত বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকলেও সামান্য কমেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক এবং বাজারভিত্তিক ডলার বিনিময় হারের ওঠাপড়ার কারণে অর্থনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। রেমিট্যান্স ব্যতীত অন্যান্য অর্থনৈতিক সূচক দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি, বিনিয়োগে আস্থা কমেছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। দেশের সম্পদের বড় অংশ কম সংখ্যক মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত, যা প্রবৃদ্ধির সুফল সবার কাছে পৌঁছাতে বাধা দিচ্ছে। পাশাপাশি প্রবৃদ্ধির গতি নিম্নমুখী।
এই প্রেক্ষাপটে এবারের বাজেট আগের বছরের তুলনায় ছোট, এবং প্রবৃদ্ধির পরিবর্তে মানুষের সামগ্রিক কল্যাণে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। অর্থ উপদেষ্টা বলেন, সরকারের প্রধান দায়িত্ব হলো জীবিকার নিরাপত্তা, শিক্ষা-স্বাস্থ্য সেবা, সুশাসন, কর্মসংস্থান ও নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা। বাজেটে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, জলবায়ু পরিবর্তন এবং দেশের উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুতির কথা বলা হয়েছে। এছাড়া ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা এবং নির্বাচনব্যবস্থার সংস্কারকেও অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে।
এই বাজেট শুধুমাত্র আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, বরং একটি কৌশলগত রূপরেখা হিসেবে পরিকল্পিত, যার মাধ্যমে সংযত ব্যয়, কাঠামোগত সংস্কার ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকার চেষ্টা করছে সাম্প্রতিক চাপ মোকাবিলা করে, আইএমএফের শর্ত পূরণ করে এবং দীর্ঘমেয়াদী সংস্কার চালিয়ে টেকসই ভবিষ্যতের ভিত্তি গড়তে।
এটি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম বাজেট এবং দেশের ৫৫তম বাজেট। বাজেট বক্তৃতায় ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার ব্যয়ের মাধ্যমে অর্থনীতিকে সংকট থেকে উত্তরণের ও জনজীবনে স্বস্তি আনার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। তবে ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করায় ব্যবসা ও সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মূল্যস্ফীতি কমিয়ে ৬.৫ শতাংশে আনার লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও বাস্তবায়নের কৌশল পুরোনো ও সীমিত। গ্রামীণ কর্মসংস্থান বাড়ানোর কথা থাকলেও বড় কোনো কর্মসূচি নেই। করমুক্ত আয়সীমাও অপরিবর্তিত রেখেছেন, যা ভবিষ্যৎ সরকারের বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মাদ আবদুল মজিদ বলেন, বিশেষ পরিস্থিতির জন্য বিশেষ বাজেট আনা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের নিজস্ব কোনো অ্যাজেন্ডা না থাকায় অসুস্থ অর্থনীতিকে সুস্থ পথে ফিরিয়ে আনার জন্য এই বাজেট প্রয়োজনীয় ছিল।
কালো টাকা ও অপ্রদর্শিত অর্থ নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থানের আভাস থাকলেও আবাসনসহ কিছু খাতে এসব অর্থ ব্যবহারের সুযোগ আগের মতোই বজায় রয়েছে। জমি-ফ্ল্যাট নিবন্ধনে বাজারমূল্য অনুসারে কর নির্ধারণ প্রস্তাব থাকলেও করহার কমানোর কারণে এ খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে এবং কালো টাকার প্রবাহ বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বাজেটে ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা বা জিডিপির ৩.৬ শতাংশ ঘাটতি ধরা হয়েছে, যার বড় অংশ অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সংগ্রহ করতে হবে। এর মধ্যে ব্যাংক থেকে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, যা বিনিয়োগ সংকোচন এবং সুদের হার বৃদ্ধির ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা অব্যাহত থাকায় সুদ পরিশোধে সরকারের ব্যয় বছরে সোয়া লাখ কোটি টাকার বেশি হতে পারে।
সরকারের পরিচালন ব্যয় আগের তুলনায় বাড়িয়েছে, যার মধ্যে সামাজিক সুরক্ষা, সুদ পরিশোধ, ভর্তুকি, বেতন-ভাতা ও অন্যান্য খাতে উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
মানবসম্পদ উন্নয়ন ও তরুণ উদ্যোক্তা তৈরিতে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। সফল যুব উদ্যোক্তাদের ঋণসীমা পাঁচ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং তরুণদের জন্য ১০০ কোটি টাকার একটি বিশেষ তহবিল গঠন প্রস্তাব করা হয়েছে। ‘তারুণ্যের উৎসব’ আয়োজনের জন্যও ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ২০২৩ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে আহত ও শহীদ পরিবারের জন্য আত্মকর্মসংস্থান প্রকল্পে ৪০৫ কোটি টাকার আলাদা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
শিক্ষা ক্ষেত্রে বিজ্ঞানভিত্তিক ও কর্মমুখী শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চশিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষায় যথাক্রমে ৩৫ হাজার ৪০৩ কোটি, ৪৭ হাজার ৫৬৩ কোটি ও ১২ হাজার ৬৭৮ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে। স্বাস্থ্যখাতে ৪১ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা এবং কৃষি ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর জন্য ৩৯ হাজার ৬২০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। দরিদ্রদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা, টিকাদান ও সামাজিক সুরক্ষা আরও জোরদার করার লক্ষ্যে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে।
সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীতে ভাতার পরিমাণ ও উপকারভোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। বিভিন্ন ভাতা মাসিক ৫০-১০০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে। স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় ৫৭ লাখ পরিবারকে খাদ্যসামগ্রী সরবরাহ এবং খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির মেয়াদ ছয় মাসে বৃদ্ধি পাবে।
বিদেশি বিনিয়োগে গতি আনতে বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি থেকে প্রকৃত বিনিয়োগে রূপান্তরের জন্য ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করার কথা বলা হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব প্রকল্প বাস্তবায়নে ৫ হাজার ৪০ কোটি টাকার বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
শুল্ক কাঠামো পরিবর্তন করে স্থানীয় শিল্প সুরক্ষা ও আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে কিছু গোষ্ঠীর স্বার্থ ও মূল্য অস্থিরতার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাজেট সংযত হলেও এর সফল বাস্তবায়ন অর্থনৈতিক পরিবেশ এবং প্রবৃদ্ধির উপর নির্ভর করবে।
কয়েকটি খাতে করের চাপ বাড়ানো হয়েছে। এম এস প্রোডাক্ট উৎপাদনে সুনির্দিষ্ট কর প্রায় ২০% বৃদ্ধি পায়। নির্মাণ সেবায় ভ্যাট বাড়িয়ে ১০% করা হয়েছে, অনলাইন পণ্যের বিক্রয়ে কমিশনে ভ্যাট ১৫% নির্ধারণ করা হয়েছে। কটন সুতা ও কৃত্রিম আঁশের ইয়ার্ন উৎপাদনে সুনির্দিষ্ট কর বাড়ানো হয়েছে। প্লাস্টিক টেবিলওয়্যার, কিচেনওয়্যার, টয়লেট্রিজ, ব্লেড, সেলফ কপি ও ডুপ্লেক্স বোর্ডে ভ্যাট বাড়ানো হয়েছে। ওটিটি প্ল্যাটফর্মে ১০% সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ভোক্তাদের স্বস্তির জন্য কিছু পণ্যে ভ্যাট অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। যেমন ব্যাংকে ১ লাখ টাকার স্থলে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত স্থিতির ওপর আবগারি শুল্ক থাকবে না। এলএনজি আমদানিতে ভ্যাট অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। স্যানিটারি ন্যাপকিন, তরল দুধ, বলপয়েন্ট, বড় স্ক্রিন কম্পিউটার মনিটর উৎপাদনে ছাড় দেয়া হয়েছে। আইসক্রিমের সম্পূরক শুল্ক কমিয়ে ৫% করা হয়েছে।
