জুলাই জাতীয় সনদকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়ার পক্ষে নয় বিএনপি। দলটির আশঙ্কা, এতে রাজনৈতিক জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। এর আগেও দলটি জুলাই ঘোষণাপত্রকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়ার বিরোধিতা করেছিল। তবে দলের শীর্ষ পর্যায়ে জুলাই সনদ ও ঘোষণাপত্রকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়ে ভিন্নমত রয়েছ
গত সোমবার রাতে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে সভাপতিত্ব করেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বৈঠকে সরকার প্রেরিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫’-এর খসড়া এবং ঘোষণাপত্রের চূড়ান্ত খসড়া নিয়ে মতবিনিময় হয়।
বৈঠকে দলের নীতিনির্ধারকরা মত দেন, জুলাই সনদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিলে কয়েকটি রাজনৈতিক দলের ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ দাবির পক্ষে যুক্তি তৈরি হবে। এতে তারা এ ঘটনাকে ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ হিসেবে প্রচার করতে পারে, যা ভবিষ্যতে বিতর্ক সৃষ্টি করবে। এক নেতা জানান, যদিও জুলাইয়ে গণ-অভ্যুত্থান ঘটেছে, তবে তা নতুন করে দেশের স্বাধীনতা আনেনি; বরং একটি দীর্ঘস্থায়ী স্বৈরশাসনের অবসান ঘটিয়েছে।
বিএনপির মত, জুলাই সনদে যে সংস্কার প্রস্তাব বা সুপারিশ রয়েছে, সেগুলো নির্বাচিত পরবর্তী সরকার গঠনের দুই বছরের মধ্যে বাস্তবায়ন সম্ভব। তবে ঘোষণাপত্রের সাংবিধানিক স্বীকৃতি নিয়ে দলের অবস্থান স্পষ্ট: একে স্বীকৃতি দিলে অতীতের ঘটনা যেমন নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী গণ-অভ্যুত্থান এবং ভবিষ্যতের অভ্যুত্থানগুলোকেও সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি উঠতে পারে, যা জটিলতা বাড়াবে।
দলটির মতে, একাত্তরের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রও ২০১১ সাল পর্যন্ত সংবিধানে যুক্ত হয়নি। সে দৃষ্টান্তে, জুলাই ঘোষণাপত্র সংবিধানে সংযুক্ত করা অপ্রয়োজনীয়। বরং ‘রাজনৈতিক দলিল’ হিসেবে রাষ্ট্রীয় আর্কাইভে সংরক্ষণই যথাযথ।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, জুলাই সনদ ও ঘোষণাপত্র নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং কিছু সংশোধনীর প্রস্তাব দিয়ে সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে। এতে বড় কোনো মতবিরোধ নেই।
বৈঠকসূত্রে জানা গেছে, বিএনপি এখন থেকে ঘোষণা নিয়ে আলোচনায় অংশ নিতে চায় না, তবে সনদ নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাবে, কেননা দলটি সংস্কার বিষয়ে আন্তরিক।
জুলাই সনদের খসড়ায় সাতটি দফা রয়েছে। এর মধ্যে সপ্তম দফায় বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী গণআন্দোলনের ঐতিহাসিক তাৎপর্যকে সংবিধানে স্বীকৃতি দেওয়ার অঙ্গীকার। ষষ্ঠ দফায় রয়েছে, নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকারের দুই বছরের মধ্যে সনদের প্রস্তাবসমূহ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি। বিএনপি এ দফাগুলোকে বাস্তবায়নযোগ্য মনে করলেও সপ্তম দফা, অর্থাৎ সাংবিধানিক স্বীকৃতির বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেছে।
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকেই জুলাই ঘোষণাপত্র প্রণয়নের উদ্যোগ চলছে, যদিও এতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। ছাত্রনেতারা দ্রুত ঘোষণাপত্রের দাবি জানালেও বিএনপি তার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
সরকারের পক্ষ থেকে খসড়া দলগুলোর কাছে পাঠানো হলে বিএনপি তা পর্যালোচনা করে মতামত দেয়। এরপর সরকারের কার্যক্রম ধীরগতির কারণে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ফের আন্দোলনে নামে, ফলে তৎপরতা বাড়ে এবং চূড়ান্ত খসড়া দলগুলোর কাছে পাঠানো হয়।
প্রথম খসড়ায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে অভ্যুত্থানের কথা বলা হয়। শেখ হাসিনার শাসনামলে বিরোধী দলগুলোর আন্দোলন, পঁচাত্তরের ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার বিপ্লব, ১৯৭৯ সালের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রবর্তন এবং এক-এগারোকে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়। সেখানে সংবিধান বাতিল বা সংশোধনের কথা থাকলেও চূড়ান্ত খসড়ায় তা সংশোধন করে শুধু সংস্কারের কথা বলা হয়েছে। এতে গুম, খুন ও দুর্নীতির বিচারের অঙ্গীকারও রয়েছে।
বিএনপি জানিয়েছে, ঘোষণাপত্র পুরো সংবিধানে যুক্ত না করে, অভ্যুত্থানের স্বীকৃতিস্বরূপ একটি অনুচ্ছেদ এবং তার উল্লেখ মাত্র রাখার পক্ষে তারা। চূড়ান্ত খসড়ায় বিএনপি ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং ভাষাগত কিছু সংশোধনী এনেছে। শিগগিরই সনদ ও ঘোষণাপত্রের খসড়া সরকারের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।
