ইরানে নজিরবিহীন বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। অভিযানে পারমাণবিক স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনকেন্দ্র এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ঘাঁটি লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। হামলায় ইরানের সেনাপ্রধানসহ অন্তত ২০ জন সামরিক কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরানও ইসরায়েল লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট ছুড়েছে। এতে অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন।
এই অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে ‘অপারেশন রাইজিং লায়ন’। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদন রোধে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। যতদিন এই হুমকি থাকবে, ততদিন অভিযান চলবে বলে জানান তিনি।
হামলা শুরু হয় বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত সাড়ে তিনটার দিকে। তেহরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। তেহরান থেকে ২২৫ কিলোমিটার দূরে নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনাতেও আঘাত হানা হয়। ইসরায়েল দাবি করেছে, তারা ইরানের কয়েক ডজন রাডার ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করেছে।
স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, বিস্ফোরণের শব্দে গভীর রাতে ঘুম ভেঙে যায় তাঁর। আতঙ্কে লোকজন রাস্তায় নেমে আসে। অনেকেই সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী জানায়, প্রায় ২০০টি যুদ্ধবিমান আটটি শহরে একযোগে হামলা চালায়। ইরানি সংবাদমাধ্যম জানায়, এসব হামলায় অন্তত ৭৮ জন নিহত ও ৩২৯ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ছয়জন পারমাণবিক বিজ্ঞানী রয়েছেন।
শুক্রবার সন্ধ্যায় তাবরিজ শহরসহ আরও কয়েকটি এলাকায় দ্বিতীয় দফায় হামলা চালায় ইসরায়েল। ফোরদো পারমাণবিক স্থাপনার কাছে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম দাবি করেছে, তারা ইসরায়েলের দুটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তেহরানে তাদের প্রধান কার্যালয়ে হামলায় বাহিনীর প্রধান হোসেইন সালামি এবং সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল মোহাম্মদ বাঘেরি নিহত হয়েছেন। ইসরায়েলের টার্গেট করা একটি ভূগর্ভস্থ কমান্ড সেন্টারে বিমানবাহিনীর কমান্ডার আমির আলী হাজিজাদেহও নিহত হন বলে জানা গেছে। হামলায় গার্ড বাহিনীর আরও ২০ শীর্ষ কর্মকর্তা প্রাণ হারিয়েছেন বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।
ইসরায়েলের হামলার পর ইরান পাল্টা হামলায় শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট ছুড়ে। তেল আবিবে একটি ভবনে ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়। এ সময় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় হয় এবং সাইরেন বেজে ওঠে। হামলায় তেল আবিবে অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন।
হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বলেন, ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু করেছে এবং এর পরিণতি তাদের ভোগ করতে হবে। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও হামলার নিন্দা জানিয়ে প্রতিশোধের ঘোষণা দেন।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এই হামলাকে ‘যুদ্ধের ঘোষণা’ হিসেবে বর্ণনা করে জাতিসংঘের কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন। এতে তিনি ইরানের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি সভার আহ্বান জানিয়েছেন।
এদিকে, ইসরায়েল যুদ্ধের প্রস্তুতি জোরদার করেছে। সেনাপ্রধান আইয়াল জামির জানান, ১০ হাজারের বেশি সেনা মোতায়েন করা হয়েছে এবং সীমান্তে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ইসরায়েলকে চ্যালেঞ্জ করলে চড়া মূল্য দিতে হবে।
হামলার বিষয়ে আগেই জানত যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ইসরায়েল তাদের পরিকল্পনার কথা আগে জানিয়েছিল, তবে এ হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সামরিক ভূমিকা ছিল না। বৃহস্পতিবারই মধ্যপ্রাচ্য থেকে কূটনীতিকদের সরিয়ে নেয় যুক্তরাষ্ট্র এবং দূতাবাসগুলোতে সতর্কতা জারি করা হয়। এর পর ইরানের সঙ্গে পূর্বনির্ধারিত বৈঠক বাতিল করা হয়।
হামলার পর জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস উদ্বেগ প্রকাশ করে দুই দেশকে সংযত থাকার আহ্বান জানান। ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার নিন্দাও জানিয়েছেন তিনি। রাশিয়া, চীন, কাতার, ওমান, জর্ডান এবং যুক্তরাজ্যসহ একাধিক দেশও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে।
