আগামীকাল শনিবার দেশে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে পালিত হবে পবিত্র ঈদুল আজহা, যা ত্যাগ ও আনন্দের এক গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব। ঈদের নামাজ শেষে সামর্থ্যবান মুসলমানরা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে পশু কুরবানি করবেন। এই ধর্মীয় উৎসবটির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে পবিত্র হজের সঙ্গে। বৃহস্পতিবার মক্কার আরাফাত ময়দানে সমবেত হয়ে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা হজের ফারজীয়তাগুলো সম্পন্ন করেছেন।
স্থানীয় হিজরি মাস অনুসারে আজ সৌদি আরবে ঈদুল আজহা পালিত হচ্ছে। সকালে মুজদালিফা থেকে ফিরে হাজিরা মিনায় অবস্থান করে পশু কুরবানি ও হজের অন্যান্য কার্যাদি সম্পন্ন করা হবে।
ঈদুল আজহার তাৎপর্য হজরত ইব্রাহিম (আ.) ও তার পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.) এর ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। হজরত ইব্রাহিম (আ.) স্বপ্নে আল্লাহর আদেশ পেয়ে তার পুত্র ইসমাইলকে কুরবানির জন্য প্রস্তুত করেন। এটি ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে এক কঠিন পরীক্ষা। সকল প্রস্তুতি সেরে তিনি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং যখন নিজ চোখ বেঁধে কোরবানি সম্পন্ন করতে যেতেন, তখন দেখা যায় আল্লাহর পক্ষ থেকে পুত্রের পরিবর্তে একটি পশু কুরবানি হয়েছে।
ঐতিহাসিক এ ঘটনাকে স্মরণ রেখে ইসলামে কুরবানির বিধান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা হজরত ইব্রাহিমের সুন্নতের অংশ হিসেবে প্রতিপাদিত। তাই প্রতিটি সামর্থ্যবান মুসলমানের জন্য কুরবানী দেয়া বাধ্যতামূলক বিবেচিত।
কুরবানি ইসলামে অত্যন্ত গুরত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে। পবিত্র কোরআনে সুরা কাউসারে ঈদের নামাজ ও কুরবানির নির্দেশনা রয়েছে। নবী করিম (সা.) বলেন, ঈদুল আজহার দিনে কুরবানির মতো আল্লাহর প্রিয় কোনো আমল নেই। গরু, মহিষ, উট, ভেড়া, ছাগলসহ যেকোনো হালাল পশু দিয়ে কুরবানি করা যায়।
আগামীকাল সকালে মুসল্লিরা নিকটস্থ ঈদগাহ বা মসজিদে দুই রাকাত ওয়াজিব নামাজ আদায় করবেন। নামাজের খুতবায় কুরবানির তাৎপর্য তুলে ধরা হবে। ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একত্রে নামাজ আদায় ও শুভেচ্ছা বিনিময় করবেন।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস দেশবাসীকে ঈদুল আজহার শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
ঈদ উপলক্ষে সরকারি, আধাসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে আলোকসজ্জা করা হয়েছে। জাতীয় সংবাদপত্র বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছে এবং টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে বিভিন্ন অনুষ্ঠানমালা সম্প্রচার করা হবে। সরকারি হাসপাতাল, কারাগার, এতিমখানা ও শিশু সদনে উন্নত খাবার পরিবেশন করা হবে।
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে সকাল থেকে বিভিন্ন সময়ে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হবে। রাজধানীর জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে সকাল সাড়ে ৭টায় প্রধান জামাত হবে, যেখানে উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করবেন। মুফতি মোহাম্মদ আবদুল মালেক এই জামাতে ইমামতি করবেন। আবহাওয়ার অবনতি হলে ঈদের প্রধান জামাত বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে সকাল ৮টায় অনুষ্ঠিত হবে।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, বায়তুল মুকাররমে মোট পাঁচটি জামাত আয়োজন করা হয়েছে, যেগুলো সকাল ৭টা থেকে শুরু করে পরপর বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত হবে।
দেশের সর্ববৃহৎ ঈদ জামাত আয়োজন হয় কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া মাঠে। সকাল ৯টায় এখানে জামাত হবে এবং রেল কর্তৃপক্ষ শোলাকিয়া স্পেশাল নামে বিশেষ দুটি ট্রেনের ব্যবস্থা করেছে। দিনাজপুর গোর-এ-শহীদ বড় ময়দানে সকাল সাড়ে ৮টায় জামাত অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে মাওলানা মো. মাহফুজুর রহমান ইমামতি করবেন।
ঢাকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে সকাল সাড়ে ৭টা ও সাড়ে ৮টায় দুটি জামাত হবে। এছাড়া সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হল লনে ও ফজলুল হক মুসলিম হলের মাঠেও ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হবে। মহানগরীর শতাধিক ঈদগাহ এবং হাজারের বেশি মসজিদে ঈদের জামাতের আয়োজন থাকবে।
চট্টগ্রামে জমিয়তুল ফালাহ জাতীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রধান জামাত সকাল সাড়ে ৭টায় অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে খতিব সৈয়দ আলাউদ্দিন আবু তালেব মোহাম্মদ আলাউদ্দিন আল কাদেরী ইমামতি করবেন। দ্বিতীয় জামাত সকাল সাড়ে ৮টায়, ইমাম মাওলানা মোহাম্মদ আহমদুল হক পরিচালিত হবে। এছাড়া চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে শহরের বিভিন্ন মসজিদ ও ঈদগাহে জামাতের আয়োজন থাকবে।
রাজশাহীতে সকাল সাড়ে ৭টায় মহানগরীর হযরত শাহ মখদুম (র.) কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হবে। আবহাওয়া অনুকূলে না হলে বিকল্পে শাহ মখদুম দরগাহ জামে মসজিদে জামাত অনুষ্ঠিত হবে। খুলনায় সার্কিট হাউস মাঠে সকাল সাড়ে ৭টায় প্রধান জামাত হবে; আবহাওয়া খারাপ হলে খুলনা টাউন জামে মসজিদে জামাত অনুষ্ঠিত হবে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ও আলিয়া মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন জায়গায় জামাতের আয়োজন রয়েছে।
বরিশালে সকাল সাড়ে ৭টায় বান্দ রোড হেমায়েত উদ্দিন কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হবে। চরমোনাই দরবার শরিফে সকাল ৯টায় জামাত হবে, যেখানে পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিম ইমামতি করবেন। সিলেটের শাহী ঈদগাহ ময়দানে সকাল ৮টায় প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হবে। রংপুরে কালেক্টরেট ঈদগাহ মাঠে সকাল ৮টায় প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হবে এবং আবহাওয়া খারাপ হলে বিকল্পে জেলা মডেল মসজিদে জামাত হবে।
ময়মনসিংহের আঞ্জুমান ঈদগাহ মাঠে সকাল সাড়ে ৭টায় প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হবে এবং শহরের বিভিন্ন মসজিদে আলাদা আলাদা জামাত অনুষ্ঠিত হবে।
সার্বিকভাবে, দেশের বিভিন্ন স্থানে যথাযথ নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে ঈদুল আজহার নামাজ ও কুরবানির আয়োজন সফলভাবে সম্পন্ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঈদের জামাত ও অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠানে নিরাপত্তা জোরদার করেছে।
