দেশে সংঘটিত গুমের বেশিরভাগ ঘটনার পেছনে পুলিশ, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব), ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চ (ডিবি) এবং কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) সংস্থাগুলো জড়িত থাকার তথ্য গুম তদন্ত কমিশনের দ্বিতীয় অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে। গুমের শিকার, প্রত্যক্ষদর্শী এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলো আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন।
বৃহস্পতিবার বাসস প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর বিভিন্ন ইউনিট গুমের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। এছাড়া সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যদের বিরুদ্ধেও গুমের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ডিজিএফআই ও এনএসআই গোয়েন্দা কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত হলেও তাদের গ্রেপ্তার বা আটক করার আইনি ক্ষমতা নেই। কিন্তু তারা যেভাবে আটক ও অপহরণ করেছে, তা সাংবিধানিক বিধি-নিষেধ লঙ্ঘন করেছে, যা দেশের আইন ব্যবস্থায় সমান্তরাল অবৈধ শক্তি গঠনের ইঙ্গিত বহন করে।
তদন্ত কমিশন জানিয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তাদের দায়িত্ব ও নিয়মনীতি অমান্য করে অভিযান চালিয়েছে, যা গভীর উদ্বেগের বিষয়।
‘আনফোল্ডিং দ্য ট্রুথ: অ্যা স্ট্রাকচারাল ডায়াগনোসিস অব এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স ইন বাংলাদেশ’ শিরোনামে এই দ্বিতীয় অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন বুধবার প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জমা দেওয়া হয়। এতে গুমে জড়িত প্রতিটি বাহিনীর ভূমিকা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
পুলিশ বাংলাদেশের প্রধান আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, যার অধীনে রয়েছে ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চ, স্পেশাল ব্রাঞ্চ, ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট ও র্যাব। তবে ২০০৯ সালের পর থেকে বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে পুলিশকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে বিরোধী রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ওপর দমন-পীড়ন চালানোর অভিযোগ বেড়েছে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, হেফাজতে নির্যাতন এবং মতপ্রকাশের অধিকার হরণ মামলাও স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ছাত্র আন্দোলন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের ওপর পুলিশের কঠোর দমন-পীড়নের ঘটনাও কম নয়, যা ২০২৪ সালের জুলাই মাসের ‘জুলাই অভ্যুত্থান’ সময় বিশেষভাবে সমালোচিত হয়। বিশেষ ক্ষমতা আইন ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ভিন্নমত দমন করতে ব্যবহৃত হয়েছে।
র্যাব ২০০৪ সালে সন্ত্রাসবাদ, মাদক চোরাচালান ও অপরাধ দমনের জন্য গঠিত হলেও পরবর্তীতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে সমালোচিত হয়েছে। গুম, হেফাজতে নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অনেক অভিযোগের কেন্দ্রে র্যাবই রয়েছে।
‘টাস্ক ফোর্স ফর ইন্টারোগেশন’ (টিএফআই) নামে একটি বিশেষ যন্ত্রণা কেন্দ্র ঢাকার কুর্মিটোলায় র্যাবের সদর দফতরে পরিচালিত হতো, যেখানে হাজার হাজার মানুষকে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হতো। ২০২৪ সালের সরকার পরিবর্তনের পর থেকে এসব নির্যাতনের প্রমাণ মুছে ফেলার প্রচেষ্টা শুরু হয়।
র্যাবের কার্যক্রম রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ভুক্তভোগীরা জানান, তারা জানত বিচার হবে না, যা দায়মুক্তির সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি ভয় এবং বিচার পাবার প্রত্যাশা কমে গেছে।
গুম তদন্ত কমিশন মনে করে, র্যাবকে বিলুপ্ত করা ছাড়া দায়মুক্তির সংস্কৃতি বন্ধ করা সম্ভব হবে না এবং মানুষের আস্থা ফিরে পাওয়া কঠিন হবে।
জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) আধুনিক ও জবাবদিহিমূলক গোয়েন্দা সংস্থায় পরিণত করার জন্য যথাযথ আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে। বর্তমানে এনএসআই বিচার বিভাগের কিংবা সংসদের তদারকির বাইরে কাজ করে, যা মানবাধিকার লঙ্ঘনের আশঙ্কা বাড়ায়।
কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এনএসআই রাজনৈতিক বিরোধী দল, নাগরিক সমাজ ও সাংবাদিকদের ওপর নজরদারি ও দমন করার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। সংস্থাটি আইনি সীমাবদ্ধতা ও স্বচ্ছতার অভাবে ব্যাপক সমালোচনার মুখে।
২০১৬ সালে গঠিত কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট সন্ত্রাসবাদ ও সংগঠিত অপরাধ দমনের দায়িত্ব পালন করে। তবে এর বিরুদ্ধে গুম, নির্যাতন ও বেআইনি আটক করার অভিযোগ উঠেছে।
সিটিটিসি ও র্যাবের মতো বাহিনী বিদেশি সমর্থন পেয়ে আসলেও তাদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ কমেনি। সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার নামে অনেক সময়ই নিরীহ ব্যক্তিরা অন্যায়ের শিকার হচ্ছেন, যা দেশের আইনের শাসন ও বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ন করছে।
গুম তদন্ত কমিশন বহু ঘটনার নথিভুক্তি করেছে, যেখানে মানুষকে জোরপূর্বক আটক করে, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রেখে, নির্মম নির্যাতন করা হয়েছে এবং পরে মনগড়া অভিযোগ তুলে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। এসব কৃত্যের মাধ্যমে সঠিক তদন্ত ও বিচার কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
