ছবি: সংগৃহীত
রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরির লক্ষ্যে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির শীর্ষ নেতাদের টার্গেট করে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল সুব্রত বাইন ও তার বাহিনী। তদন্তে উঠে এসেছে, এই ষড়যন্ত্রের পেছনে সক্রিয় ছিল আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধ ঘোষিত শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন নেতা। হাতিরঝিলে গ্রেপ্তার হওয়া সুব্রত ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী মোল্লা মাসুদের জবানবন্দিতে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে বলে নিশ্চিত করেছে গোয়েন্দা পুলিশ।

পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রতিবেশী একটি দেশ থেকে হুন্ডির মাধ্যমে মোটা অঙ্কের অর্থ পাঠানো হয়েছিল বলে জানান তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। সেই অর্থ দিয়েই সংগঠিত হচ্ছিল শ্যুটার ও কিলারদের একটি চক্র। রাজধানীর মগবাজার, শাহবাগ, গুলশান ও বাড্ডা এলাকায় সন্ত্রাসীদের হাতে অস্ত্র পৌঁছানোর প্রস্তুতি চলছিল। এসব অস্ত্র পাঠানো হয়েছিল কুষ্টিয়া থেকে, যেখানে সুব্রত বাহিনীর স্থায়ী আস্তানা ছিল।
রাজধানীর হাতিরঝিল থানায় দায়ের হওয়া অস্ত্র মামলায় সুব্রত বাইনকে ৮ দিন ও তার তিন সহযোগীকে ৬ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। মঙ্গলবার রাতে আটক হওয়ার পর গোয়েন্দা হেফাজতে তাদের জিজ্ঞাসাবাদে উঠে আসে এই রোমহর্ষক পরিকল্পনার বিস্তারিত।
গ্রেপ্তার হওয়া অপর তিনজন হলেন: আবু রাসেল মাসুদ ওরফে মোল্লা মাসুদ, আরাফাত ইবনে নাসির ওরফে শ্যুটার আরাফাত এবং এমএএস শরীফ। আদালতে হাজির করার সময় তাদের হেলমেট ও বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরানো ছিল।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, এই চক্রটির সঙ্গে প্রতিবেশী একটি দেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের কয়েকজন সাবেক শীর্ষ নেতার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। তারাই অস্ত্র ও অর্থ সরবরাহের নির্দেশনা দিতেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর মধ্যে ভীতি তৈরি করা এবং খুনখারাবির মাধ্যমে রাজনৈতিক বিভেদ বাড়িয়ে দিয়ে পরিস্থিতিকে এমন জায়গায় নেওয়া, যাতে আবারও একটি দমনমূলক রাজনৈতিক কাঠামোর আবশ্যকতা তৈরি হয়।
সুব্রত বাইন আদালতে বলেন, ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এলে তাকে ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় প্রথমে রাখা হয়, যা তাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করে। এরপর বারবার বিএনপির সঙ্গে যোগাযোগ করেও দেশে ফিরতে না পারায় তিনি আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠজনদের শরণাপন্ন হন। তিনি জানান, ৫ আগস্টের পর বিএনপির সঙ্গে ফের যোগাযোগের চেষ্টা করলেও নেতারা তাকে এড়িয়ে যান। তখন তিনি আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ একটি মহলের ‘মিশনে’ নামেন এবং বিএনপি-জামায়াত নেতাদের টার্গেট করেন।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, টার্গেট কিলিংয়ের পর দলের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করাই ছিল এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য। পরিকল্পনা অনুযায়ী, খুনের পর প্রচার করা হতো—এক দলের নেতাকে অন্য দলের নেতারাই হত্যা করেছেন।
সুব্রত বাহিনীর সদস্যরা সবাই উঠতি বয়সী এবং অধিকাংশই উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান, যারা পুলিশের খাতায় ‘অচেনা মুখ’। ডিবির একাধিক টিম এখন তালিকা ধরে তাদের খুঁজে বের করে অস্ত্র উদ্ধার ও গ্রেপ্তারের কাজ করছে।
রিমান্ড আদেশের পর সুব্রত আদালতের উদ্দেশে বলেন, “আমার নামাজ যেন কাজা না হয়।” আদালত পুলিশকে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখার নির্দেশ দেন।
এই ঘটনার পর রাজনীতির পটভূমিতে একটি অজানা ও অন্ধকারময় অধ্যায় উন্মোচিত হলো, যার গভীরে রয়েছে ক্ষমতা, প্রতিশোধ এবং রাষ্ট্রব্যবস্থাকে নষ্ট করার একটি সুপরিকল্পিত নীলনকশা। গোয়েন্দা সূত্র বলছে, তদন্ত আরও গভীরে যাচ্ছে—শিগগিরই আরও চমকপ্রদ তথ্য সামনে আসতে পারে।
