ছবি: সংগৃহীত
জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ এর খসড়া প্রকাশ করেছে। এ খসড়া এরই মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে পাঠানো হয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে ছাত্র-জনতার নেতৃত্বে সংঘটিত সফল গণ-অভ্যুত্থানের পটভূমিতে একটি নতুন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের উদ্যোগে সংবিধান, নির্বাচন, বিচার বিভাগ, প্রশাসন, পুলিশ ও দুর্নীতি দমন কমিশনের সংস্কারের লক্ষ্যে খসড়া সনদ প্রণয়ন করা হয়েছে।
কমিশন বলছে, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সমতা, মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচারের যে আদর্শ নিয়ে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা এখনও পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। বিগত পাঁচ দশকে গণতন্ত্র বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল থেকেছে, এবং দলীয়ীকরণের মাধ্যমে রাষ্ট্রযন্ত্র একচেটিয়াভাবে ব্যবহার হয়েছে।
২০০৯ সালে একটি দলীয় সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর রাষ্ট্র ক্রমে স্বৈরতান্ত্রিক পথে অগ্রসর হয়। মানবাধিকার লঙ্ঘন, গুম, খুন, নির্যাতন, মামলা ও হামলার মাধ্যমে একটি ভীতিকর শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়। রাষ্ট্রযন্ত্র দলীয় বন্দনার উপকরণে পরিণত হয়।
১৫ বছরের শাসনে সংবিধান বিকৃতি, দমনমূলক আইন, দলীয় প্রশাসন, নির্বাচনী ব্যবস্থার ধ্বংস এবং ব্যাপক দুর্নীতির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সম্পদের লুটপাট চলে। এর জবাবে শিক্ষার্থীদের আহ্বানে অসংখ্য নাগরিক বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়ে একটি সফল গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেন। এই অভ্যুত্থানে ১,৪০০-এর বেশি মানুষ নিহত ও ২০,০০০-এর বেশি আহত হন। তাদের আত্মত্যাগের ফলেই শাসকগোষ্ঠী পরাজিত হয়ে পালিয়ে যায়।
এই পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাষ্ট্র সংস্কারে উদ্যোগ গ্রহণ করে। ৮ আগস্ট ২০২৪ সালে সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়: সংবিধান, নির্বাচন, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন, পুলিশ ও দুর্নীতি দমন কমিশন। ৭ অক্টোবর প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এসব কমিশন গঠিত হয় এবং ৩১ জানুয়ারি ২০২৫-এর মধ্যে তারা তাদের সুপারিশ জমা দেয়।
এরপর ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠিত হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন প্রধান উপদেষ্টা এবং সংশ্লিষ্ট ছয়টি কমিশনের প্রতিনিধিরা। তাদের দায়িত্ব ছিল সংস্কার-সংশ্লিষ্ট সুপারিশ নিয়ে রাজনৈতিক দল ও জোটগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে জাতীয় ঐকমত্য গঠন। কমিশনের কার্যক্রম শুরু হয় ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ থেকে।
কমিশন ছয়টি কমিশনের প্রতিবেদনের সংক্ষিপ্তসার ও সুপারিশসমূহ ৩৮টি রাজনৈতিক দল ও জোটের কাছে পাঠায়। তাদের মতামতের ভিত্তিতে এবং ২০ মার্চ থেকে ১৯ মে পর্যন্ত ৪৪টি বৈঠকের মাধ্যমে কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দুই ধাপে আলোচনা চালায়। এতে অংশ নেয় ৩২টি দল ও জোট। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ প্রণীত হয়।
এই সনদে অংশগ্রহণকারী দল ও জোট প্রতিনিধিরা সংবিধান, বিচার, নির্বাচন, প্রশাসন, পুলিশ ও দুর্নীতি দমন ব্যবস্থায় কাঠামোগত, আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছান। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের স্মরণে এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণে এই সনদ ঘোষণা করা হয়।
সনদে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, এর প্রতিটি সুপারিশ বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক ও আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে এবং পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকার এই সনদের বাস্তবায়ন দুই বছরের মধ্যে সম্পন্ন করবে। গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাসকে সংবিধানে স্বীকৃতি দেওয়ার অঙ্গীকারও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এখন পর্যন্ত যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে তা পরবর্তী অংশে সংযোজিত হবে বলে জানানো হয়েছে।
