মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শনিবার রাতে ঘোষণা দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় বিমান হামলা চালিয়েছে। এসব স্থাপনার মধ্যে রয়েছে ফর্দো ভূগর্ভস্থ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র, নাতাঞ্জ এবং ইস্পাহান। এই হামলার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে সম্পৃক্ত হলো।
স্থানীয় সময় রাত আটটার কিছু আগে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প এ তথ্য জানান। তিনি লেখেন, “আমাদের অভিযান সফল হয়েছে। সমস্ত যুদ্ধবিমান এখন ইরানের আকাশসীমার বাইরে। ফর্দোতে সর্বোচ্চ পরিমাণ বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছে।” ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, “বিশ্বের আর কোনো বাহিনী এই ধরনের অভিযান চালাতে সক্ষম নয়।”
এর আগে, হোয়াইট হাউস জানায়, ট্রাম্প দুই সপ্তাহের মধ্যে ইরানে হামলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। সেই ঘোষণার মাত্র দুই দিন পরেই এই হামলা চালানো হলো।
এদিকে, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ আগেই এ হামলার বিষয়ে জানত বলে জানা গেছে। ট্রাম্প পরবর্তীতে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তার বরাতে এসব তথ্য জানা গেছে।
হামলার পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। তবে ঠিক কতটি বোমা ফেলা হয়েছে বা হামলায় ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা কী পরিমাণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
ট্রাম্প শুরুতে ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া নিয়ে দ্বিধায় ছিলেন। এমনকি হোয়াইট হাউসের ভেতরেও কিছু উপদেষ্টা তাঁকে কেবল গোয়েন্দা সহায়তা সীমিত রাখার পরামর্শ দেন। অন্যদিকে, কেউ কেউ নিশ্চিত করতে চেয়েছেন, হামলার সম্ভাব্য ফলাফল সম্পর্কে প্রেসিডেন্ট যেন সুস্পষ্ট ধারণা রাখেন এবং পরবর্তী সম্পৃক্ততা সীমিত থাকে।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স সম্প্রতি বারবার ইরানে সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে যুদ্ধে জড়ানোর বিপদের বিষয়ে সতর্ক করে আসছিলেন। ট্রাম্পও তাঁর ঘনিষ্ঠদের জানিয়েছেন, দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে যাওয়ার ইচ্ছা তাঁর নেই। বরং কূটনৈতিক সমাধানকেই তিনি গুরুত্ব দিচ্ছেন। কিন্তু ইরান সে পথে আসবে কি না, তা অনিশ্চিত।
ইসরায়েলের হামলার প্রেক্ষিতে ট্রাম্প তাঁর উপদেষ্টা ভ্যান্স এবং মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফকে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। তবে ইরানি কর্মকর্তাদের প্রতিক্রিয়া ছিল ধীর এবং অস্পষ্ট, যা প্রেসিডেন্টকে বিরক্ত করে। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠদের অভিযোগ, ইরানের পক্ষ থেকে যোগাযোগকারী ব্যক্তিরা আদৌ দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতিনিধি কিনা, তা বোঝা যাচ্ছে না।
বর্তমানে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা হামলার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু গত ৯ জুন ট্রাম্পকে ফোন করে হামলার সিদ্ধান্তের কথা জানান। যদিও শুরুতে ট্রাম্প পুরোপুরি ইসরায়েলের পদক্ষেপকে সমর্থন করেননি। এমনকি ১৩ জুন ইসরায়েলের হামলার পর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর বিবৃতিতে যুদ্ধ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে দূরে রাখার কথাই বলা হয়। এতে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থনের কোনো ইঙ্গিত ছিল না।
কিন্তু পরে, ইসরায়েলের প্রথম হামলা সফল হলে, ট্রাম্প নিজের ভূমিকাকে সামনে আনতে শুরু করেন। সাংবাদিকদের তিনি জানান, অভিযানে তাঁর অবদান অনেক বড়। জি-৭ সম্মেলনে অংশ নিতে কানাডা যাওয়ার প্রস্তুতির সময় তিনি জানান, “সম্ভবত সবচেয়ে বড় বোমা ফেলতে হবে”, যার মাধ্যমে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ‘বাংকার–বিধ্বংসী’ বোমার ইঙ্গিত দেন।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার পর ট্রাম্প ইরাক যুদ্ধের সমালোচনা করে রাজনৈতিক পরিচিতি গড়ে তোলেন। তবে তাঁর প্রথম মেয়াদে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সামরিক পদক্ষেপ ছিল ইরানি জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যা, যেটি হস্তক্ষেপবিরোধী সমর্থকদের ভিন্নমত তৈরি করলেও ট্রাম্পের ভাষ্যে তা ছিল ‘যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে নেওয়া প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ’।
