ছবি: সংগৃহীত
২০২৪ সালের এই দিনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ঘটে যায় এক নাটকীয় পালাবদল গণবিক্ষোভ ও সহিংসতার চাপে পদত্যাগ করে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মুক্তিযুদ্ধ ও বিচারপ্রক্রিয়ায় অগ্রণী ভূমিকা পালনকারী এই নেত্রী, তার একটি বিতর্কিত মন্তব্যের কারণে নিজেই ইতিহাসের ঘূর্ণিপাকে পড়ে যান।
“মুক্তিযোদ্ধার নাতি-নাতনিদের পাবে না, তবে রাজাকারের নাতিরা পাবে?” এই বক্তব্য ছিল আন্দোলনের ঘূর্ণির কেন্দ্রবিন্দু।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা সম্প্রতি প্রকাশ করেছে একটি অনুসন্ধানী পডকাস্ট সিরিজ: ‘৩৬ জুলাই বাংলাদেশের অভ্যুত্থান’। কেভিন হার্টিনের পরিচালনায় এবং তামারা খান্ডোকারের প্রযোজনায় নির্মিত এই সিরিজে তুলে ধরা হয়েছে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পটভূমি, ছাত্র আন্দোলনের বিস্তার এবং সরকারি দমন-পীড়নের করুণ চিত্র।
পডকাস্টে বলা হয়, কোটাব্যবস্থার বিরুদ্ধে ক্ষোভ থেকে শুরু হলেও আন্দোলন দ্রুত রূপ নেয় সরকার পতনের দাবিতে। শেখ হাসিনার বিতর্কিত ‘রাজাকার’ মন্তব্যের পর দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। “আমি কে, তুমি কে—রাজাকার রাজাকার” স্লোগান ছড়িয়ে পড়ে শহর থেকে শহরে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী প্রাপ্তি তপসী বলেন, “সেদিনই শেখ হাসিনার জন্য শেষ পেরেক ঠুকে দেওয়া হয়েছিল।”
পডকাস্টে উল্লেখ করা হয়, ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ আন্দোলনকারীদের উপর হামলা চালায়। শিক্ষার্থী আশিফা খাতুন বলেন, “মেয়েরা রক্তাক্ত হয়েছিল, কেউ কেউ অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল, তাদের ওপরও হামলা হয়।” ছাত্রলীগের সদস্যরা ইট-পাটকেল ও হকিস্টিক দিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর চড়াও হয়, এমনকি হাসপাতালে গিয়েও আক্রমণ চালায়।
সাবেক প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম পডকাস্টে দাবি করেন, সরকার প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের নির্দেশ দেয়। ফরেনসিকভাবে যাচাই করা একটি ফোন রেকর্ডে শেখ হাসিনার কণ্ঠস্বর শোনা যায়, যেখানে তিনি বলেন, “জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ করো। সংঘর্ষের চিত্র নয়, কেবল ক্ষয়ক্ষতির ছবি দেখাও।”
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী মালিহা বলেন, “৩৬ জুলাই আমি প্রথম কেঁদেছিলাম। শেখ হাসিনা পদত্যাগ করায় মনে হয়েছিল, আমাদের সব কষ্ট স্বার্থক হয়েছে।”
আন্দোলনের পর ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। ১৫ জুলাইয়ের সহিংসতায় জড়িত শতাধিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়। যদিও আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ এ অভিযোগ অস্বীকার করে, দাবি করে এটি একটি ষড়যন্ত্রমূলক প্রচারণা।
তবে দেশের হাজার হাজার তরুণের কাছে এই দিন এখনো গাঁথা রয়েছে স্মৃতির গভীরে। আন্দোলনে অংশ নেওয়া এক শিক্ষার্থী বলেন, “আমরা একসঙ্গে কেঁদেছি, একসঙ্গে লড়েছি। সেই দিন আমার মনে আবার মানুষের প্রতি বিশ্বাস ফিরিয়ে দিয়েছিল।”
৩৬ জুলাই, যা এক সময়ের কল্পনা মনে হতো, এখন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বাস্তব ও স্মরণীয় মাইলফলক।
