সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন—এই তিনটি বিষয়ের সমন্বয় ছাড়া বাংলাদেশের জনগণ কোনো নির্বাচন মেনে নেবে না বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, যারা সংস্কার ছাড়া নির্বাচন চায়, তারাই প্রকৃতপক্ষে ভোট বিলম্বের ষড়যন্ত্র করছে। শুক্রবার (১১ জুলাই) যশোর ঈদগাহ মোড়ে জুলাই পদযাত্রার অংশ হিসেবে আয়োজিত এক পথসভায় তিনি এসব কথা বলেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, স্বাধীনতার ৫৪ বছরেও দেশে রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া হয়নি। সবকিছু দলীয়করণে পরিণত হয়েছে—পুলিশ, প্রশাসন, আমলাতন্ত্র সবই এখন ক্ষমতাসীন দলের অনুসারী। তিনি একটি মেধা ও যোগ্যতাভিত্তিক প্রশাসনিক কাঠামোর দাবি জানান। তার মতে, সবচেয়ে ভেঙে পড়া প্রতিষ্ঠান হচ্ছে নির্বাচন কমিশন, আর দুর্নীতি দমন কমিশনে নিরপেক্ষ নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। সেনাবাহিনী যেন দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ভূমিকা রাখে—এটাই প্রত্যাশা, গুমের সঙ্গে কোনো বাহিনীর সম্পৃক্ততা কাম্য নয়।
তিনি বলেন, কোনো দুর্নীতিবাজ বা দখলবাজকে ভয় পাওয়া উচিত নয়। ইতিহাসে দেখা গেছে, অল্প কয়েকজন মানুষ দিয়েই বড় আন্দোলন শুরু হয়েছে। তাই একজন ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ালে লাখো মানুষের সমান শক্তি ধারণ করতে পারেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
যশোরের স্থানীয় সমস্যা তুলে ধরে নাহিদ ইসলাম বলেন, জেলার সাধারণ মানুষের চিকিৎসা সেবার জন্য খুলনায় যেতে হয়, কারণ জেনারেল হাসপাতালের করোনা কেয়ার ইউনিট ও আইসিইউ এখনও পুরোপুরি চালু হয়নি। ভবদহ অঞ্চলের দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা, বেনাপোল সীমান্তে দুর্নীতি ও মাদকের বিস্তারও তিনি সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন।
পথসভায় এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, বাংলাদেশে সবসময় ছাত্ররাই জীবন দিয়ে আন্দোলন করেছে, ফল ভোগ করেছে অন্যরা। তিনি জানান, তারা ঘরে ফিরবেন না, সংস্কার ছাড়া কোনো নির্বাচন নয়।
তিনি অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ষড়যন্ত্র করে এনসিপির শাপলা প্রতীক না পেতে নানা চেষ্টা চালাচ্ছে। কারণ, এনসিপি সংস্কারের প্রশ্নে আপসহীন। তিনি বলেন, শেখ হাসিনার নিয়ন্ত্রিত সংবিধান, বিচার বিভাগ কিংবা প্রশাসন নয়—তারা চান একটি ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা। সংস্কার বাস্তবায়িত না হলে জনগণ আগের চেয়েও বড়ভাবে রাজপথে নেমে আসবে।
সভায় বক্তব্য রাখেন দলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন, কেন্দ্রীয় সদস্য সাকিব শাহরিয়ার, খালিদ সাইফুল্লাহ জুয়েলসহ কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা।
এর আগে যশোর শহরের একটি হোটেলে এনসিপির জেলা শাখা আয়োজিত মতবিনিময় সভায় বক্তব্য রাখেন দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরউদ্দীন পাটোয়ারী, নেতা তাসনিম জারা ও নুসরাত তাবাসসুম। সভায় যশোরের ৪ শহীদ পরিবারের সদস্য এবং ১৫ জন আহত অংশ নেন।
হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, নির্বাচন কমিশনের কিছু সদস্যের কার্যক্রম সন্দেহজনক। তিনি দাবি করেন, এনসিপি কোনো পক্ষপাতদুষ্ট নির্বাচন কমিশন চায় না—তাদের প্রয়োজন বাংলাদেশপন্থি কমিশন ও সরকার। তিনি বলেন, ৩ আগস্ট জুলাই সনদ ঘোষণার দাবিতে রাজপথে নামতে হবে।
তিনি আরও বলেন, একটি রাজনৈতিক দল চায় নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগকে ফিরিয়ে আনতে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি আওয়ামী লীগ ফেরে, তাহলে জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে দমননীতি শুরু হবে।
বিএনপির নেতৃত্বের সমালোচনা করে তিনি বলেন, তৃণমূলের কর্মীরা নির্যাতিত হলেও কেন্দ্রীয় নেতারা ভোগান্তিমুক্ত জীবনযাপন করেন। মাঠে খেলতে হলে খেলোয়াড় হিসেবে নামতে হবে, ক্যান্টনমেন্ট কিংবা বিদেশ থেকে নির্বাচন নিয়ন্ত্রণ করা চলবে না।
আহতদের চিকিৎসা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগে তিনি জানান, স্বাস্থ্য উপদেষ্টা পুরোপুরি সমন্বয় করতে পারছেন না, এনসিপি নিজে উদ্যোগ নেবে।
নাসীরউদ্দীন পাটোয়ারী বলেন, জুলাই সনদ দ্রুত ঘোষণা করতে হবে এবং তা সংবিধানে স্থান দিতে হবে। গণপরিষদের বাইরে সংবিধান সংশোধন সম্ভব নয়—এ যুক্তি বাতিল করতে হবে। সংবিধান সংস্কার ছাড়া বর্তমান রাজনৈতিক কাঠামো টিকে যাবে, আর জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হবে না।
